Homeসারাদেশচট্টগ্রামচমেকে ডায়ালাইসিস বন্ধের শঙ্কা, বিপাকে ২৭৬ রোগী

চমেকে ডায়ালাইসিস বন্ধের শঙ্কা, বিপাকে ২৭৬ রোগী

২৯ নভেম্বর শেষ হচ্ছে স্যান্ডোরের ১০ বছরের চুক্তি; নতুন সরকারি ব্যবস্থা চালু হতে সময় লাগতে পারে ফেব্রুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেবা নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় পরিচালিত স্যান্ডোর কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টারের ১০ বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ২৯ নভেম্বর। এরপর কেন্দ্রটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়া ২৭৬ জন কিডনি রোগী বিপাকে পড়বেন।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে হেপাটাইটিস পজিটিভ রোগীদের নিয়ে। বর্তমানে স্যান্ডোর কেন্দ্রে ১৮১ জন হেপাটাইটিস নেগেটিভ এবং ৯৫ জন পজিটিভ রোগী ডায়ালাইসিস নিচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, চট্টগ্রামে হেপাটাইটিস পজিটিভ রোগীদের ডায়ালাইসিস দেওয়ার মতো বিকল্প সরকারি ব্যবস্থা নেই। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিকল্প সেবা চালু করা না গেলে এসব রোগীর নিয়মিত চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস কোনো ঐচ্ছিক চিকিৎসা নয়। নিয়মিত ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল রোগীদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসা না হলে শারীরিক জটিলতা দ্রুত বাড়তে পারে। ফলে কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

স্যান্ডোরের সহকারী ব্যবস্থাপক তায়েফ রহমান জানান, চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে এলেও ২৯ নভেম্বরের পর কেন্দ্রটি চালু থাকবে কি না, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে সংকট মোকাবিলায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় ডায়ালাইসিস সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপোর (সিএমএসডি) মাধ্যমে চমেকে ৩১টি এবং জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটে প্রায় ৬০টি নতুন ডায়ালাইসিস মেশিন কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

তিনি জানান, নতুন মেশিন কেনা ও স্থাপনের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত রোগীদের চিকিৎসা কীভাবে চালু রাখা যায়, সে বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবে হাসপাতাল সূত্র বলছে, সরকারি ব্যবস্থাপনায় নতুন ডায়ালাইসিস কেন্দ্র পুরোপুরি প্রস্তুত করতে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি বা মার্চ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ স্যান্ডোরের বর্তমান চুক্তি শেষ হওয়ার পর নতুন সরকারি ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার মধ্যে কয়েক মাসের ব্যবধান তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই সময়টিই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে রোগীদের জন্য। নিয়মিত ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হওয়া এসব রোগীর অনেকেরই বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই। ফলে বর্তমান কেন্দ্রের কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, নতুন সরকারি ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান স্যান্ডোর কেন্দ্রের সেবা অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা করা হোক। তাদের মতে, নতুন মেশিন কেনা বা কেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়া চলতে পারে, কিন্তু এর মধ্যবর্তী সময়ে রোগীদের চিকিৎসা বন্ধ রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

চমেক হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা রয়েছে। হাসপাতাল সূত্র অনুযায়ী, স্যান্ডোরের ৩১টি মেশিনের পাশাপাশি চমেকের নিজস্ব ২০টি মেশিনে আরও প্রায় ৯০ জন রোগী ডায়ালাইসিস সেবা নিচ্ছেন। তবে স্যান্ডোর কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে গেলে অতিরিক্ত ২৭৬ রোগীর চাপ সামাল দেওয়া বর্তমান সক্ষমতায় কতটা সম্ভব হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

২০১৭ সালের ৪ মার্চ চমেক হাসপাতালের নিচতলায় ৩১টি মেশিন নিয়ে স্যান্ডোর কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টারের কার্যক্রম শুরু হয়। পিপিপির আওতায় পরিচালিত কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের কিডনি রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেবা দিয়ে আসছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়ালাইসিস সেবা পরিচালনায় শুধু মেশিন থাকলেই হয় না; প্রয়োজন প্রশিক্ষিত জনবল, পানি পরিশোধন ব্যবস্থা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং রোগী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা। ফলে নতুন মেশিন কেনার পাশাপাশি এসব অবকাঠামো ও জনবলও নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে স্যান্ডোর কেন্দ্র বন্ধ হলে ৪৫ জন অভিজ্ঞ কর্মীও কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সংকটটি শুধু রোগীদের চিকিৎসাসেবায় সীমাবদ্ধ থাকছে না; কেন্দ্রটির কর্মীদের কর্মসংস্থানও এর সঙ্গে যুক্ত।

সব মিলিয়ে ২৯ নভেম্বরের পর চমেকের ডায়ালাইসিস সেবা কীভাবে চলবে, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। একদিকে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে, অন্যদিকে নতুন সরকারি সক্ষমতা তৈরি হতে আরও কয়েক মাস লাগতে পারে। এই সময়ের মধ্যে কোনো অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা না হলে চমেকের ২৭৬ জন নিয়মিত ডায়ালাইসিস রোগীর চিকিৎসা কার্যত অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।

তাই নতুন কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনার পাশাপাশি ২৯ নভেম্বরের পর থেকে ফেব্রুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত রোগীদের চিকিৎসা নির্বিঘ্ন রাখার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সেবা পরিকল্পনা দ্রুত ঘোষণা করাই এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments