রায়হাান আহমেদ:
রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে যানবাহনের শব্দ, ধুলাবালি আর মানুষের ছুটে চলার মধ্যে এক টুকরো সবুজের দেখা মিলেছে তেজগাঁওয়ের পেপসি গলিতে। সড়ক বিভাজকের ফাঁকা জায়গায় সেখানে গড়ে উঠেছে শাক-সবজি, ফল ও ঔষধি গাছের বাগান। এর পেছনে রয়েছেন তিনজন সাধারণ মানুষ, একজন রিকশাচালক, একজন চা বিক্রেতা ও একজন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মী। নিজেদের অবসর সময় আর শ্রম দিয়ে তাঁরা শুধু আশপাশের পরিবেশকে সবুজ করেননি, বাগানের উৎপাদিত সবজি দিয়ে কমিয়েছেন নিজেদের বাজারনির্ভরতাও।
তাঁদের একজন কামাল হোসেন সারাদিন রিকশা চালান, তোফায়েল হোসেন ব্যস্ত থাকেন চায়ের দোকান নিয়ে, আর প্রশান্ত কুমার রায় দায়িত্ব পালন করেন একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা সুপারভাইজার হিসেবে। পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও সুযোগ পেলেই তাঁরা সড়ক বিভাজকের গাছগুলোর পরিচর্যা করেন। তাঁদের উদ্যোগে একসময় অব্যবহৃত পড়ে থাকা জায়গাটি এখন পথচারীদের দৃষ্টি কাড়ছে।
তেজগাঁওয়ের পেপসি গলিতে কয়েক মাস আগে সড়ক বিভাজক নির্মাণের পর এর ফাঁকা জায়গাগুলো কাজে লাগানোর চিন্তা করেন প্রশান্ত কুমার রায়। পরে অন্যদের সঙ্গে নিয়ে সেখানে সবজি ও বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগানো শুরু করেন তিনি।
বাগানে রয়েছে লালশাক, পুঁইশাক, কলমিশাক, কচুশাক, মরিচ, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, শসা, ঢ্যাঁড়স, শিম, করলা, বেগুন ও ফুলকপিসহ নানা ধরনের সবজি। পাশাপাশি লাগানো হয়েছে আখ, পেঁপে এবং তুলসী, অ্যালোভেরা, পাথরকুচি, কেশরাজ, হলুদ ও নিমের মতো বিভিন্ন গাছ।
বার্জার পেইন্টের কার্যালয়ে নিরাপত্তা সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত প্রশান্ত কাজের ফাঁকে বাগানের পরিচর্যা করেন। গাছের পোকামাকড় দমনে প্রাকৃতিক বালাইনাশক ব্যবহারেরও চেষ্টা করেন তিনি।
প্রশান্তের ভাষ্য, সড়ক বিভাজকের ফাঁকা জায়গাগুলো কাজে লাগানোর পরিকল্পনা থেকেই সবজি ও গাছ লাগানো শুরু করেছিলেন তাঁরা। ধীরে ধীরে জায়গাটি সবুজ বাগানে পরিণত হয়েছে।
বাগানে উৎপাদিত সবজি নিজেদের খাবারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি সহকর্মীদের মধ্যেও ভাগ করে দেন প্রশান্ত। তাঁর মতে, এতে বাজার থেকে সবজি কেনার প্রয়োজন কিছুটা কমেছে। পথচারীদের কেউ কেউ ঔষধি গাছ সম্পর্কে জানতে চান, আবার প্রয়োজন হলে গাছও চান। সাধ্য অনুযায়ী তাঁদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন তিনি।
কামাল হোসেনের জীবনে প্রতিদিনের আয়-রোজগারই বড় বাস্তবতা। সারাদিন রিকশা চালিয়ে সংসারের খরচ জোগাতে হয় তাঁকে। এর মধ্যেও অবসর সময়ে সড়ক বিভাজকের গাছগুলোর পরিচর্যা করেন তিনি।
কামাল বলেন, “শখ করেই এখানে সবজি ও ফলের গাছ লাগিয়েছি। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই এই অল্প জায়গায় কিছু শাক-সবজি লাগিয়েছি। নিজেরাও খাচ্ছি, আবার কেউ চাইলে তাকেও দিচ্ছি।”
কামালের কাছে বাগানটি শুধু শখের বিষয় নয়; এটি সংসারের ব্যয় সামলানোরও একটি ছোট উপায়। বাজার থেকে প্রতিটি সবজি কিনতে হয় না, আবার নিজের হাতে উৎপাদিত খাবার পাওয়ার আনন্দও রয়েছে।
তাঁর প্রত্যাশা, শহরের উপযুক্ত ফাঁকা জায়গাগুলো পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে আরও মানুষ সবজি চাষে আগ্রহী হবেন। এতে পারিবারিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাজারের ওপর নির্ভরশীলতাও কিছুটা কমানো সম্ভব।
দীর্ঘদিন ধরে পেপসি গলিতে চায়ের দোকান পরিচালনা করছেন তোফায়েল হোসেন। সড়ক বিভাজকের ফাঁকা জায়গায় ময়লা-আবর্জনা জমতে দেখে জায়গাটির চেহারা বদলানোর কথা ভাবেন তিনি। পরে পরিচিতদের পরামর্শে সেখানে সবজি চাষ শুরু করেন।
চায়ের দোকান সামলানোর পাশাপাশি গাছে পানি দেওয়া, বীজ বপন ও পরিচর্যার কাজ করেন তোফায়েল। বাগানে উৎপাদিত সবজি তাঁর নিজের খাবারের চাহিদাও পূরণ করছে। ফলে বাজার থেকে সবজি কেনার প্রয়োজন কমেছে।
তিনজনের এই উদ্যোগে বড় কোনো বিনিয়োগের চেয়ে শ্রম, সময় ও নিয়মিত পরিচর্যাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। নগরজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও সামান্য জায়গা যে মানুষের কাজে লাগতে পারে, তাঁদের বাগান তারই একটি উদাহরণ।
পেপসি গলি দিয়ে নিয়মিত চলাচল করেন গোলাম কিবরিয়া। সড়ক বিভাজকে সবজিবাগান দেখে তাঁর ভালো লাগে।
গোলাম কিবরিয়া বলেন, শহরের ব্যস্ত সড়কগুলোতে সচরাচর শাক-সবজি কিংবা গাছপালা চোখে পড়ে না। কিন্তু এই রাস্তা দিয়ে গেলে সবুজের দেখা মেলে। ছোট জায়গায় এমন উদ্যোগ সত্যিই ভালো লাগে। ফাঁকা জায়গাগুলোতে এভাবে গাছ লাগানো গেলে প্রকৃতি ও মানুষের দুয়েরই উপকার হবে।
একই সড়কে চলাচলকারী চালক সোলাইমানও উদ্যোগটির প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, ঢাকার বিভিন্ন স্থানে উপযুক্ত খালি জায়গায় গাছ লাগানো গেলে পরিবেশের উন্নতির পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সবুজের প্রতি সচেতনতাও বাড়বে।
সড়ক বিভাজকের এই বাগান পথচারীদের কাছে কেবল সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এটি শহরের অব্যবহৃত জায়গা কীভাবে জনকল্যাণে কাজে লাগানো যায়, সেই ভাবনারও একটি উপলক্ষ।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বাড়ির আঙিনা বা ব্যক্তিগত জমি না থাকায় অনেকের পক্ষে শাক-সবজি চাষ করা কঠিন। এ অবস্থায় ছাদ, বারান্দা, বাড়ির আশপাশের উপযুক্ত জায়গা কিংবা পরিকল্পিত নগর সবুজায়নের সুযোগ কাজে লাগানো যেতে পারে।
তবে সড়ক বিভাজকে সবজি চাষের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি, যান চলাচলের নিরাপত্তা, পথচারীদের ঝুঁকি, পরিচ্ছন্নতা এবং সেচের পানির মান বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে ব্যস্ত সড়কের ধুলাবালি ও যানবাহনের দূষণের কারণে উৎপাদিত সবজি নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তেজগাঁওয়ের পেপসি গলির কামাল, তোফায়েল ও প্রশান্তের উদ্যোগ দেখিয়েছে, সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা নগরের চেহারায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তাঁদের বাগান হয়তো রাজধানীর সবজির বাজারে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না, তবে নিজের খাবারের কিছুটা জোগান, পারিবারিক ব্যয় কমানো এবং অব্যবহৃত জায়গার সৃজনশীল ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটি অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত।
ব্যস্ত ঢাকার এক টুকরো সড়ক বিভাজকে তাই গড়ে উঠেছে ভিন্ন এক গল্প, যেখানে সবুজের পরিচর্যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবিকার সংগ্রাম, সাশ্রয়ের চেষ্টা এবং নগরকে একটু বাসযোগ্য করে তোলার আকাঙ্ক্ষা।



