Homeবিবিধউপ-সম্পাদকীয়আপত্তির শাসন, অধিকারের সংকোচন: বাংলাদেশ কি ক্রমেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে?

আপত্তির শাসন, অধিকারের সংকোচন: বাংলাদেশ কি ক্রমেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে?

তানভীর রায়হান:

একটি সমাজ কতটা স্বাধীন, তার পরিচয় শুধু সংবিধানে লেখা অধিকার দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং মানুষ বাস্তবে কতটা নির্ভয়ে কথা বলতে পারে, গান গাইতে পারে, বই প্রকাশ করতে পারে, খেলাধুলায় অংশ নিতে পারে এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন করতে পারে, তা দিয়েও স্বাধীনতার পরিমাপ হয়। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক আয়োজন, খেলাধুলা ও প্রকাশনা ঘিরে বাধা এবং বন্ধের যেসব অভিযোগ সামনে আসছে, তা এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে এনেছে—রাষ্ট্রের অনুমোদিত পরিসর কি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে?

দিরাইয়ে মেয়েদের ফুটবল ম্যাচ স্থগিত, বিভিন্ন স্থানে কনসার্ট ও বাউল গানের আসর বন্ধ, নৌকাবাইচে বিধিনিষেধ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী বিক্রিকে কেন্দ্র করে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে বাধার অভিযোগ, ঘটনাগুলো ভিন্ন ভিন্ন হলেও এর মধ্যে একটি অভিন্ন উদ্বেগ রয়েছে। কোনো আয়োজনের বিরুদ্ধে আপত্তি উঠলেই যদি সেটি বন্ধ হয়ে যায়, তবে প্রশ্ন উঠবেই: সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কার হাতে, আর নাগরিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব কার?

কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অন্যের ধর্মীয় অনুভূতি ও বিশ্বাসের প্রতি সম্মান দেখানোও প্রয়োজন। কিন্তু সম্মান প্রদর্শন আর চাপের মুখে অধিকার ছেড়ে দেওয়া এক বিষয় নয়। কোনো অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে। আইন ভঙ্গের নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে প্রশাসন তদন্ত করতে পারে। কিন্তু কেবল একটি গোষ্ঠীর আপত্তির কারণে অনুষ্ঠান বাতিল করা হলে, সেখানে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব সব পক্ষকে সন্তুষ্ট করা নয়; বরং সবার জন্য সমানভাবে আইন প্রয়োগ করা। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া গণতান্ত্রিক বাস্তবতার অংশ হতে পারে, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের চাপের কাছে সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের মানুষের অধিকার বিসর্জন দেওয়া গণতন্ত্রের শর্ত নয়। আজ কোনো নারী ফুটবল ম্যাচ, বাউল গানের আসর কিংবা চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধ হলে বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু একই ধরনের বাধা বারবার ঘটলে তা বৃহত্তর সামাজিক স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এখানে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনের কাজ চাপের মুখে পিছু হটা নয়, বরং আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। নিরাপত্তার বাস্তব ঝুঁকি থাকলে তা মোকাবিলার ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো পক্ষের হুমকি থাকলে হুমকিদাতার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। হুমকির কারণে আয়োজকদেরই অনুষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য করা হলে কার্যত চাপ প্রয়োগকারীরাই সিদ্ধান্ত নির্ধারণের ক্ষমতা পেয়ে যায়।

একই সঙ্গে এসব ঘটনায় সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট হওয়া দরকার। কোন অনুষ্ঠান কেন বন্ধ হলো, কোন আইনের অধীনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং আয়োজকদের অধিকার রক্ষায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এসব প্রশ্নের জবাব জনসমক্ষে থাকা উচিত। নীরবতা সব সময় সম্মতির প্রমাণ নয়; তবে ধারাবাহিক নীরবতা অনিশ্চয়তা বাড়ায় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করতে পারে।

মতপ্রকাশ, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক জীবনে অংশগ্রহণের অধিকার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোতেও স্বীকৃত। বাংলাদেশের সংবিধানেও চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, যদিও এসব অধিকারের প্রয়োগে আইনসম্মত সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। সেই সীমাবদ্ধতা অবশ্যই যুক্তিসংগত, প্রয়োজনীয় ও আইনভিত্তিক হতে হবে; কোনো গোষ্ঠীর অনানুষ্ঠানিক কর্তৃত্বের ওপর নির্ভরশীল হওয়া চলবে না।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি বহুমাত্রিক। লোকসংগীত, নৌকাবাইচ, নাটক, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা এবং নানা মতের বই, সবই এই সমাজের পরিচয়ের অংশ। এসবের কোনো একটিকে অপ্রয়োজনীয় বা অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করে অন্যের স্বাধীনতা সংকুচিত করা হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজের সামগ্রিক সৃজনশীলতা।

তাই এখন প্রয়োজন অভিযোগের রাজনৈতিক ব্যবহার নয়, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত; অস্পষ্ট আশ্বাস নয়, প্রশাসনের স্পষ্ট অবস্থান; এবং চাপের কাছে নতি স্বীকার নয়, আইনের সমান প্রয়োগ। কোনো আয়োজন নিয়ে আপত্তি থাকতেই পারে, কিন্তু আপত্তি জানানো আর অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া এক নয়।

রাষ্ট্র যদি নাগরিকের স্বাধীনতা রক্ষায় দৃঢ় না থাকে, তবে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা ও বাধা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বাংলাদেশ এমন বাস্তবতা চায় না, যেখানে আয়োজনের আগে আয়োজকদের ভাবতে হবে—কেউ আপত্তি তুলবে কি না। মানুষকে নিরাপদে কথা বলতে দিতে হবে, সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ দিতে হবে এবং ভিন্নমতকে সহাবস্থানের জায়গা দিতে হবে। কারণ একটি দেশের স্বাধীনতা শুধু তার ভূখণ্ডে নয়, মানুষের চিন্তা, কণ্ঠ ও সাংস্কৃতিক জীবনের পরিসরেও বেঁচে থাকে।

–গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মী

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments