Homeঅর্থনীতিজ্বালানি, পরিবহন ও প্রযুক্তিতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে চায় বাংলাদেশ

জ্বালানি, পরিবহন ও প্রযুক্তিতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে চায় বাংলাদেশ

বিশেষ প্রতিনিধি:

বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, পরিবহনব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে জাপানের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তব প্রকল্পে রূপ দিতে একটি যৌথ মন্ত্রী পর্যায়ের কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে তারেক রহমান বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত বাস্তবায়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

জাপান সফরের দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় অবকাঠামো, আধুনিক পরিবহন, জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থায় জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

জাপানি বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে তাঁর সরকার বিধিবিধান, করনীতি, শুল্ক ছাড়করণ এবং অর্থ স্থানান্তরপ্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য ও কার্যকর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ আকর্ষণ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের সুফল দুই দেশের মানুষের কাছে পৌঁছায়।

সফরের কর্মসূচিতে জাপানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। এর মাধ্যমে দেশটির জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থার কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে তিনি চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরে জাপানের অন্যতম প্রধান জ্বালানি প্রতিষ্ঠান জেইআরএর (JERA) স্থলভিত্তিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করেন।

পরে বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে একই প্রিফেকচারের ইচিকাওয়া শহরে নিপ্পন এক্সপ্রেস পরিচালিত একটি সরবরাহ ও পণ্য পরিবহনকেন্দ্র ঘুরে দেখেন তিনি।

বাংলাদেশ যখন জ্বালানি অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং পরিবহন ও পণ্য সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন প্রধানমন্ত্রীর এসব পরিদর্শন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। তবে সফরসূচি-সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্যে এসব পরিদর্শনের ভিত্তিতে কোনো নির্দিষ্ট বিনিয়োগ চুক্তি বা আর্থিক অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করা হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সফরে ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও উপদেষ্টারা।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের বিষয়েও গুরুত্ব দেন তারেক রহমান। মিয়ানমারের অবনতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি সহিংসতা বন্ধ, বাধাহীন মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপের ওপর গুরুত্ব দেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে জাপানকে সক্রিয় যোগাযোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।

মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানবিক প্রচেষ্টায় জাপানের সহযোগিতার প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।

তারেক রহমান অবাধ, উন্মুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়ে তোলার বিষয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের অভিন্ন অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।

তিনি বহুপক্ষীয় সহযোগিতা, বিশ্বশান্তি এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখার বিষয়ে দুই দেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচনে সমর্থন দেওয়ায় জাপানকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বৈঠকটিকে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও গভীর করার পাশাপাশি শান্তি ও সমৃদ্ধির অভিন্ন লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

দ্বিপক্ষীয় সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন, অগ্রাধিকারমূলক সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করা এবং সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণের জন্য একটি যৌথ মন্ত্রী পর্যায়ের কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। একই সঙ্গে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে আমন্ত্রণ জানান।

স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৪৫ মিনিটে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কান্তেইতে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা ও গার্ড অব অনারের মধ্য দিয়ে শীর্ষ বৈঠক শুরু হয়। পরে দুই নেতা যৌথ বিবৃতি দেন এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে আয়োজিত ভোজসভায় অংশ নেন।

এদিকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা গবেষণা, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য এবং আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ও চিকিৎসক ডা. জুবাইদা রহমান।

মঙ্গলবার টোকিওতে সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক স্বাস্থ্যবিষয়ক সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।

তিনি স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সাশ্রয়ী করা, জনস্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন, স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার সুযোগ সম্প্রসারণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন। পাশাপাশি কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা, সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি এবং ফ্যামিলি কার্ডসহ পরিবারভিত্তিক সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির বিষয়েও আলোচনা করেন তিনি।

চিকিৎসক হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জুবাইদা রহমান বলেন, কার্যকর স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়ন, গবেষণা এগিয়ে নেওয়া এবং আধুনিক চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। উদীয়মান স্বাস্থ্য ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও জাপান অভিজ্ঞতা ও সম্পদ বিনিময়ের মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

শিশুদের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে টেকসই সামাজিক ব্যবস্থা, শক্তিশালী অর্থনীতি, মানসম্মত শিক্ষা এবং দারিদ্র্য ও সহিংসতা থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি।

‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ লক্ষ্য অর্জনে স্বাস্থ্য কূটনীতির গুরুত্ব তুলে ধরে জুবাইদা রহমান মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বেসরকারি সংস্থা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও জনকল্যাণমূলক ফাউন্ডেশনগুলোর অবদানের প্রশংসা করেন। বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং নতুন স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও সহায়তার আহ্বান জানান তিনি।

স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন ও টেকসই চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে গৃহীত উদ্যোগে সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনকে সরকারের পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন জুবাইদা রহমান।

সেমিনারে নিপ্পন ফাউন্ডেশন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের সম্মানসূচক চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়াসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments