Homeবিবিধসম্পাদকীয়পুলিশ বাহিনীকে আস্থায় নিতে হবে

পুলিশ বাহিনীকে আস্থায় নিতে হবে

পুলিশ রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অপরাধ দমন, এসব দায়িত্ব পালনের জন্য একটি পেশাদার, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী অপরিহার্য। ফলে পুলিশের কোনো সদস্য দায়িত্বে অবহেলা করলে, শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে কিংবা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়ালে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি পুরো বাহিনীকে আস্থার সংকটে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দায়িত্ব পালনের সময় কোনো পুলিশ সদস্য শৃঙ্খলা ভঙ্গ বা অপরাধে জড়ালে শুধু বিভাগীয় শাস্তির মধ্যে ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ থাকবে না; প্রয়োজনে ফৌজদারি মামলাসহ রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি দায়িত্ব পালনে সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ পুলিশের ভেতরে অপরাধ, দায়িত্বে অবহেলা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ থাকলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট সদস্যের ওপর পড়ে না; এর মাধ্যমে পুরো প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তবে এর সমাধান হতে হবে ব্যক্তি ও ঘটনার ভিত্তিতে। কোনো সদস্যের অপরাধের দায় পুরো পুলিশ বাহিনীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন ন্যায়সংগত নয়, তেমনি পুলিশের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধেও ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক বিচার এবং স্বচ্ছ বিভাগীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূলনীতি।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় পুলিশ বাহিনীও ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ স্টেশন আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অনেক এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম কার্যত ব্যাহত হয়েছিল। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময় বহু পুলিশ সদস্য কর্মস্থলে যেতে ভয় পাচ্ছিলেন এবং অনেক জায়গায় পুলিশি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত এবং ২ হাজার ৩০৮ জন আহত হন। একই সময়ে পুলিশ স্টেশন ও পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে।

পরবর্তী সময়ে পুলিশ সদস্যদের কাজে ফেরানো এবং বাহিনীর মনোবল পুনরুদ্ধার করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ১২ আগস্ট ২০২৪-এর মধ্যে দেশের প্রায় সব থানায় পুলিশ কার্যক্রম পুনরায় শুরু হলেও বিভিন্ন স্থানে অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম পুরোপুরি ফিরতে সময় লাগে।

এই অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। পুলিশকে জবাবদিহির আওতায় রাখতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে আইনসম্মতভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ ও নেতৃত্বও নিশ্চিত করতে হবে।

পুলিশের রাজনৈতিকীকরণ নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের বাহিনী হতে পারে না। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে পুলিশের আনুগত্যের দিক পরিবর্তিত হবে, এমন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি নাগরিকের জন্যও বিপজ্জনক। পুলিশের আনুগত্য হতে হবে সংবিধান, আইন ও রাষ্ট্রের প্রতি; কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতি নয়।

একইভাবে পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা, বদলি, সাময়িক বরখাস্ত কিংবা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণের গুরুত্ব রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসব ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করা এবং নির্দোষদের হয়রানি থেকে সুরক্ষা দেওয়া, দুই বিষয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ একজন পুলিশ সদস্য অপরাধ করলে তার বিচার হওয়া দরকার; কিন্তু শুধু বাহিনীর সদস্য হওয়ার কারণে কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। আবার রাজনৈতিক পরিচয়, পদমর্যাদা কিংবা প্রভাবের কারণে কোনো অভিযুক্ত সদস্য যেন আইনের বাইরে থাকতে না পারেন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

এখন প্রয়োজন পুলিশ সংস্কারের একটি সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা। নিয়োগ ও পদায়নে পেশাদারিত্ব, প্রশিক্ষণে মানবাধিকার ও আইন, তদন্তে দক্ষতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কর্মপরিবেশ, সবগুলো বিষয়কে সংস্কারের অংশ করতে হবে।

পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদেরও বুঝতে হবে, জনগণ তাদের প্রতিপক্ষ নয়। পুলিশের ক্ষমতার মূল উদ্দেশ্য নাগরিককে ভয় দেখানো নয়; নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়া। একজন সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে যেন হয়রানি বা অবহেলার শিকার না হন, অভিযোগ নিয়ে যেন যথাযথ সেবা পান এবং আইন প্রয়োগে যেন বৈষম্যের শিকার না হন, এটাই হওয়া উচিত জনবান্ধব পুলিশের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

বর্তমানে পুলিশের ওপর একদিকে দায়িত্ব পালনের চাপ, অন্যদিকে অতীতের কর্মকাণ্ড নিয়ে জবাবদিহির দাবি, দুই ধরনের চাপই রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাহিনীর ভেতরে আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। একই সঙ্গে যারা আইন ভেঙেছেন বা দায়িত্বে গুরুতর ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে।

পুলিশকে দুর্বল করে নয়, বরং শক্তিশালী, পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলেই নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। পুলিশকে কোনো সরকারের পেটোয়া বাহিনী নয়, রাষ্ট্র ও জনগণের সেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং আইনের প্রতি দায়বদ্ধ একটি পুলিশ বাহিনীই পারে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে।

সুতরাং এখন সময় পুলিশকে একদিকে কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনা, অন্যদিকে একটি সৎ ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে পুনর্গঠনের। অপরাধী পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সৎ ও দায়িত্বশীল সদস্যদের মর্যাদা ও নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা দরকার। জনগণের আস্থা ছাড়া পুলিশ কার্যকর হতে পারে না; আর কার্যকর পুলিশ ছাড়া রাষ্ট্রের নাগরিক নিরাপত্তাও পূর্ণাঙ্গভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments