Homeবিবিধটপ ফাইভপূজামণ্ডপে বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক, নিরাপত্তায় পুলিশের বিশেষ নজর

পূজামণ্ডপে বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক, নিরাপত্তায় পুলিশের বিশেষ নজর

সম্প্রীতি রক্ষায় কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ কমিটি, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা

তানভীর রায়হান:

শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দলীয় ও প্রশাসনিক পর্যায়ে প্রস্তুতি জোরদার করেছে সরকার ও ক্ষমতাসীন বিএনপি। দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে স্থানীয় আয়োজকদের সঙ্গে সমন্বয় করে দলীয় স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েনের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। অন্যদিকে, পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা, নজরদারি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সম্ভাব্য নাশকতা মোকাবিলায় বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, প্রতিটি পূজামণ্ডপে তিন থেকে চারজন করে দলীয় স্বেচ্ছাসেবক পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করবেন। পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে তাঁরা নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখবেন এবং কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার আশঙ্কা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে অবহিত করবেন। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধে জড়ালে তাঁকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছে দলটি।

বিএনপির এ উদ্যোগের পাশাপাশি পুলিশের নিরাপত্তাব্যবস্থাও এবারের দুর্গোৎসবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। ফলে দলীয় স্বেচ্ছাসেবকদের কার্যক্রম প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে পরিচালনা এবং তাঁদের দায়িত্বের সীমা বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দুর্গাপূজার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং পূজা উদ্‌যাপন কমিটিগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য গত ৯ অক্টোবর ১২ সদস্যের কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করে বিএনপি। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে দলের যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকনকে। সদস্যসচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন জয়ন্ত কুমার কুণ্ডু, অপর্ণা রায় দাস, অমলেন্দু দাস অপু, জন গোমেজ, নিপুণ রায় চৌধুরী, রমেশ দত্ত, পার্থ দে মণ্ডল, জয়দেব রায়, মিল্টন বৈদ্য ও গণেশ চন্দ্র রায় সাহস।

দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছে, কেন্দ্রীয় কমিটি পূজার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় নেতাকর্মী ও পূজা উদ্‌যাপন কমিটির মধ্যে সমন্বয় করবে। এর মাধ্যমে কোথাও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পর্যবেক্ষণ কমিটির সদস্য পার্থ দে মণ্ডল বলেন, প্রতিটি পূজামণ্ডপে বিএনপির পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবক দল থাকবে। দলের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদ্‌যাপনের জন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

কমিটির সদস্যসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে অনলাইনে বৈঠক করেছেন। প্রতিটি পূজামণ্ডপে তিন থেকে চারজন করে দলীয় স্বেচ্ছাসেবক রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাঁরা পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করবেন।

তিনি আরও বলেন, কেউ অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বিবেচনা করে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় পুলিশের পক্ষ থেকেও বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ গত ৬ অক্টোবর ডিএমপি সদর দপ্তরে নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আয়োজিত সভায় পূজামণ্ডপগুলোতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের কথা জানান।

পুলিশের পরিকল্পনায় পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, দায়িত্বে থাকা সদস্যদের বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার এবং পোশাকধারী ও সাদাপোশাকের পুলিশ মোতায়েনের বিষয় রয়েছে। পাশাপাশি বিশেষায়িত নিরাপত্তা ইউনিট প্রস্তুত রাখার পরিকল্পনাও জানানো হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপপ্রচার ও উসকানিমূলক তথ্য ছড়ানোর বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। গত ৪ অক্টোবর পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করার এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য নজরে এলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর পরামর্শ দেন।

ওই সভায় পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ, অগ্নিনিরাপত্তা এবং নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়েও আলোচনা হয়।

দুর্গাপূজার আগে গত ৭ অক্টোবর হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ধর্ম, বর্ণ ও পরিচয় যেন মানুষের অধিকার ও সুযোগের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, এমন বাংলাদেশ গড়তে চায় সরকার। প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য।

একই দিন হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে পাঁচ কোটি টাকা এবং বৌদ্ধধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে তিন কোটি টাকা বরাদ্দের চেক হস্তান্তর করা হয়।

এদিকে, ১০ অক্টোবর রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও দুর্গাপূজার নিরাপত্তা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বৈঠক শেষে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, সারা দেশের পূজামণ্ডপে স্থানীয় পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে বিএনপির নেতাকর্মীরা স্বেচ্ছাসেবক ও প্রহরীর ভূমিকা পালন করবেন। পূজা উদ্‌যাপনে কোনো ধরনের বিঘ্ন যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-২ আসনের সংসদ সদস্য আমানউল্লাহ আমান বলেন, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ‘ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার’ নীতি সামনে রেখে কেরানীগঞ্জে দুর্গাপূজা নির্বিঘ্ন করতে নেতাকর্মীরা দায়িত্ব পালন করবেন। গত ৯ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে তিনি প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে তিন শিফটে পাহারার ব্যবস্থা করার কথাও জানান।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও দুর্গাপূজাকে সর্বজনীন ও জাতীয় উৎসব হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গত ৯ অক্টোবর চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে তিনি রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছে দেওয়া এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক দেশ গড়ার ওপর গুরুত্ব দেন।

বাংলাদেশে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কোনো কোনো বছর বিচ্ছিন্ন সহিংসতা, প্রতিমা ভাঙচুর, গুজব ও উসকানিমূলক প্রচারণার ঘটনা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে নিরাপত্তা প্রস্তুতির পাশাপাশি দ্রুত তথ্য যাচাই, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

এবার বিএনপি সরকার ও দলীয় পর্যায়ে নিরাপত্তার বিষয়ে একাধিক উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তা নির্ভর করবে পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়, গুজব প্রতিরোধ এবং কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর।

দলীয় স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্থানীয় পূজা উদ্‌যাপন কমিটির মতামত ও সমন্বয় নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করতে হবে।

ধর্মীয় উৎসবের নিরাপত্তা কেবল একটি সম্প্রদায়ের বিষয় নয়; এটি প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার ও রাষ্ট্রের দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে দুর্গোৎসব নির্বিঘ্ন করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি প্রশাসনিক সক্ষমতা, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবারের প্রস্তুতির কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments