Homeবিবিধসম্পাদকীয়অপতথ্যের রাজত্ব চলতে দেওয়া যায় না

অপতথ্যের রাজত্ব চলতে দেওয়া যায় না

ডিজিটাল যুগে তথ্যই শক্তি। কিন্তু সেই তথ্য যখন সত্যের পরিবর্তে গুজব, বিকৃতি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার বাহন হয়ে ওঠে, তখন তা শুধু ব্যক্তিকে নয়, পুরো সমাজকে বিভ্রান্ত করতে পারে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় সাইবার পরিসরে অপতথ্যের বিস্তার এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্পর্শকাতর কোনো ঘটনা ঘটলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে নানা ধরনের দাবি ও ‘ন্যারেটিভ’ ছড়িয়ে পড়ছে। এর মধ্যে কিছু ভুল, কিছু বিভ্রান্তিকর এবং কিছু ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তৈরি।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাই এর যথেষ্ট উদাহরণ।

কুমিল্লায় কিশোর অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা, মধুর ক্যান্টিনকে ‘ইশারাত মঞ্জিল’ হিসেবে উপস্থাপন কিংবা প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর ঘিরে ভিসা নিষেধাজ্ঞার অপপ্রচার, এসব ঘটনায় একটি বিষয় স্পষ্ট: তথ্যের শূন্যতা কখনো শূন্য থাকে না। দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান সময়মতো তথ্য না দিলে সেই জায়গা দখল করে নেয় গুজব, অনুমান ও রাজনৈতিক প্রচারণা।

রিউমর স্ক্যানারের হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ৩ হাজার ২১০টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এই পরিসংখ্যানকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ একটি মিথ্যা তথ্য কতজন দেখেছে, সেটিই একমাত্র বিবেচ্য নয়; সেটি কত দ্রুত ছড়িয়েছে, কত মানুষের সিদ্ধান্ত ও ধারণাকে প্রভাবিত করেছে এবং সামাজিক বিভাজন কতটা বাড়িয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

এখানেই সরকারের দায়িত্বের প্রশ্নটি সামনে আসে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি দীর্ঘ সময় নীরব থাকে, তাহলে সেই নীরবতা নিছক প্রশাসনিক বিলম্ব থাকে না; তা অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও গুজবের জন্য জায়গা তৈরি করে। ঘটনাস্থলের তথ্য, তদন্তের অগ্রগতি, সরকারি অবস্থান বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য দ্রুত প্রকাশ না পেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুমানই অনেকের কাছে ‘তথ্য’ হয়ে ওঠে।

এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। সংকট তৈরি হওয়ার পর সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিক্রিয়া জানানোর পুরোনো পদ্ধতি যথেষ্ট নয়।

এখন প্রয়োজন তাৎক্ষণিক, সমন্বিত ও যাচাই করা তথ্যপ্রবাহ। কোনো ঘটনা সম্পর্কে যতটুকু নিশ্চিত তথ্য রয়েছে, তা দ্রুত প্রকাশ করতে হবে। কোনো তথ্য নিশ্চিত নয়, সেটিও স্পষ্ট করে জানাতে হবে। জনগণকে অন্ধকারে রেখে গুজব মোকাবিলা করা যায় না।

তবে এর অর্থ এই নয় যে অপতথ্য দমনের নামে রাষ্ট্রকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্বিচার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিতে হবে। বরং বিপরীতটাই জরুরি। সত্য প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো আরও বেশি স্বচ্ছতা, আরও দ্রুত তথ্য প্রকাশ এবং আরও শক্তিশালী জবাবদিহি। সমালোচনা, ভিন্নমত কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তব্যকে ‘অপতথ্য’ আখ্যা দিয়ে দমন করার প্রবণতা তৈরি হলে প্রকৃত অপতথ্যবিরোধী উদ্যোগও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

প্রযুক্তি এ ক্ষেত্রে বড় সহায়ক হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং ও ডিজিটাল ফরেনসিকের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সন্দেহজনক কনটেন্ট শনাক্ত করা সম্ভব। সরকার চাইলে পেশাদার জনবল ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি সার্বক্ষণিক ফ্যাক্ট-চেকিং ও র‍্যাপিড রেসপন্স কাঠামো গড়ে তুলতে পারে। এর কাজ হবে কোনো রাজনৈতিক পক্ষের হয়ে প্রচারণা চালানো নয়; বরং যাচাই করা তথ্য দ্রুত জনগণের সামনে তুলে ধরা।

এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা অপরিহার্য। কোন তথ্যকে কেন মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর বলা হলো, তার প্রমাণ প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে ভুল শনাক্ত হলে তা সংশোধনের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। জনগণের আস্থা আদেশ দিয়ে অর্জন করা যায় না; তা অর্জন করতে হয় ধারাবাহিকভাবে সঠিক তথ্য দিয়ে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও রাষ্ট্রের কার্যকর যোগাযোগ দরকার। মেটার মতো প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে সমন্বিত ভুয়া অ্যাকাউন্ট, সহিংসতার উসকানি কিংবা ক্ষতিকর কনটেন্টের বিষয়ে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ বাড়তে পারে। কিন্তু কনটেন্ট অপসারণের ক্ষেত্রে অবশ্যই আইন, স্বচ্ছতা এবং নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার বিবেচনায় রাখতে হবে।

একই সঙ্গে গণমাধ্যমকেও আত্মসমালোচনা করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, এটি কোনো সংবাদের সত্যতার প্রমাণ নয়। সাংবাদিকতার প্রথম শর্তই হলো যাচাই।

একটি ভুল তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হাজারো পোস্টের চেয়েও বেশি ক্ষতি করতে পারে, কারণ পাঠকের কাছে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার একটি আলাদা মূল্য রয়েছে।

নাগরিকদের ডিজিটাল সাক্ষরতাও বাড়াতে হবে। ছবি, ভিডিও, স্ক্রিনশট কিংবা কোনো ব্যক্তির নামে প্রচারিত বক্তব্য দেখলেই তা বিশ্বাস বা শেয়ার করার প্রবণতা কমাতে হবে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তথ্য যাচাই এবং ডিজিটাল নাগরিকত্বের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই মূলত একটি আস্থার লড়াই। রাষ্ট্র যদি দ্রুত সত্য জানায়, গণমাধ্যম যদি দায়িত্বশীলভাবে যাচাই করে এবং নাগরিক যদি তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলে, তাহলে গুজবের বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নীরব থাকবে, গণমাধ্যম যাচাই না করে প্রকাশ করবে এবং নাগরিক যাচাই না করে শেয়ার করবে, এভাবে একটি সুস্থ তথ্যপরিবেশ তৈরি হতে পারে না।

অতএব, এখন আর ‘দেখা যাক কী হয়’ নীতিতে থাকার সুযোগ নেই। ঘটনা ঘটার পর তথ্যের মাঠ ছেড়ে দিলে সেই মাঠ অন্যরা দখল করবে। রাষ্ট্রের কাজ মানুষের কণ্ঠ বন্ধ করা নয়; বরং সত্য তথ্যের পথটি উন্মুক্ত রাখা। অপতথ্যের মোকাবিলায় সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার কোনো সেন্সরশিপ নয়, সঠিক সময়ে প্রকাশিত সত্য, দৃশ্যমান প্রমাণ এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা।

দেশের তথ্যপরিসরকে গুজবের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। এখনই প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং নাগরিকের অধিকারসম্মত জাতীয় তথ্য-প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা। কারণ সত্য প্রকাশে রাষ্ট্র যত দেরি করবে, মিথ্যা তত দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments