তানভীর রায়হান:
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে জনশক্তি রপ্তানি ও আমদানি-নির্ভর বাণিজ্য। তবে সম্পর্ককে এখন সেই গণ্ডির বাইরে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) সভাপতি মো. আনোয়ার শহীদ।
তার মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জুনের মালয়েশিয়া সফরের পর দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগে নতুন গতি এসেছে। এর ধারাবাহিকতায় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), হালাল পণ্যের সনদ, বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তি ও নতুন শিল্পে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো এসব উদ্যোগকে বাস্তব ব্যবসায়িক ফলাফলে রূপ দেওয়া।
সাম্প্রতিক সময়ে বিএমসিসিআইয়ের একটি প্রতিনিধিদল মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, ব্যবসায়ী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করেছে। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে মালয়েশিয়ার প্রথম দফার বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া এফটিএ আলোচনা অক্টোবরের শেষ দিকে ঢাকায় হওয়ার কথা জানানো হয়। দুই দেশ ২০২৭ সালের মধ্যে এফটিএ সম্পন্ন করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে।
মালয়েশিয়ায় অবস্থানকালে সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজের সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন মো. আনোয়ার শহীদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি নয়ামিকা।
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজ: এফটিএ নিয়ে এতদিন আলোচনা হলেও এবার কী কারণে বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে?
আনোয়ার শহীদ: দুই দেশের সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা আছে—এটি গুরুত্বপূর্ণ। জুনে দুই প্রধানমন্ত্রী এফটিএ ২০২৭ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। এখন অক্টোবরের শেষ দিকে প্রথম দফার আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হচ্ছে।
তবে এফটিএ কোনো এক বৈঠকে শেষ হওয়ার বিষয় নয়। ট্যারিফ, বাজারে প্রবেশাধিকার, পণ্যের তালিকা, সার্ভিস, বিনিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নিজেদের স্বার্থগুলো পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা এবং কোন পণ্যে আমরা সুযোগ নিতে পারি, তা নির্ধারণ করা।
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজ: বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারে মালয়েশিয়াকে আপনি কোথায় দেখতে চান?
আনোয়ার শহীদ: এখনো আমাদের রপ্তানি ঝুড়ি তুলনামূলকভাবে ছোট। তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শক্তিশালী হলেও মালয়েশিয়ার বাজারে আমাদের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। শুধু পোশাক নয়—খাদ্যপণ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, আসবাব, কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন খাতে সুযোগ আছে।
মালয়েশিয়া থেকে আমরা যেসব পণ্য আমদানি করি, সেগুলোর প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত বাণিজ্যকে একমুখী না রেখে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ বাড়ানো। ২০২৫ সালে দুই দেশের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১২ দশমিক ১৮ বিলিয়ন মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত।
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজ: হালাল পণ্যে বাংলাদেশ কতটা সম্ভাবনা দেখছে?
আনোয়ার শহীদ: এটি আমাদের জন্য বড় একটি সুযোগ। হালালকে শুধু খাদ্যপণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। খাদ্য, প্রসাধনী, ওষুধ, ফার্মাসিউটিক্যালস, লজিস্টিকস, পর্যটন—অনেক ক্ষেত্রেই এর বাজার রয়েছে।
সমস্যা হলো আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু ‘হালাল’ বললেই হবে না। আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সার্টিফিকেশন ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা দরকার। মালয়েশিয়ার জাকিমের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশে হালাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থার কারিগরি সক্ষমতা বাড়াতে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা পাওয়া গেলে রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজ: তাহলে বাংলাদেশের প্রধান ঘাটতি কোথায়—সনদে, নাকি উৎপাদন ব্যবস্থায়?
আনোয়ার শহীদ: দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। একটি পণ্য হালাল কি না, তা নির্ধারণে কাঁচামাল থেকে শুরু করে উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিবহন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া দেখতে হয়। ট্রেসেবিলিটি থাকতে হয়।
আমাদের পরীক্ষাগার, প্রশিক্ষিত জনবল ও সার্টিফিকেশন সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। জাকিমের সঙ্গে আলোচনায় কারিগরি সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং মান-অনুসরণ ব্যবস্থা নিয়ে কথা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে তারা শুধু মালয়েশিয়া নয়, অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করতে পারে।
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজ: জনশক্তি রপ্তানিতে দীর্ঘদিনের অভিযোগ—উচ্চ অভিবাসন ব্যয়। সমাধান কী?
আনোয়ার শহীদ: দক্ষতা এবং স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা—দুটিই দরকার। আমরা দীর্ঘদিন ধরে ‘সিন্ডিকেট’ নিয়ে আলোচনা শুনছি। নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা থাকলে প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে এবং ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে কর্মী নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাবেন এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগী কমবে। একজন কর্মী বিদেশ যাওয়ার আগেই যদি বড় অঙ্কের ঋণে পড়ে যান, তাহলে তার বিদেশে কাজের সুফল পেতে সময় লাগে।
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজ: মালয়েশিয়ায় সীমিতসংখ্যক রিক্রুটিং কোম্পানির মাধ্যমে কর্মী নেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আপনাদের অবস্থান কী?
আনোয়ার শহীদ: মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে নির্দিষ্টসংখ্যক কোম্পানির মাধ্যমে কর্মী নেওয়ার যে আলোচনা রয়েছে, সেখানে আমাদের মূল বক্তব্য হলো—স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা দরকার। কতগুলো প্রতিষ্ঠান থাকবে, কীভাবে নির্বাচন হবে, কীভাবে ব্যয় নির্ধারণ হবে—সবকিছু স্পষ্ট হওয়া উচিত।
আমরা চাই, বাংলাদেশি কর্মীরা যেন কম খরচে এবং নিরাপদ প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় যেতে পারেন। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার নিয়োগদাতারাও দক্ষ ও প্রয়োজনীয় কর্মী পান।
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজ: দক্ষ জনশক্তির বাজারে বাংলাদেশের নতুন সুযোগ কোথায়?
আনোয়ার শহীদ: ভবিষ্যৎটা দক্ষ কর্মীর। সাধারণ শ্রমিকের পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর, প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং ও বিভিন্ন কারিগরি খাতে মালয়েশিয়ার চাহিদা রয়েছে।
আমাদের তরুণদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দিতে পারলে বড় সুযোগ তৈরি হবে। মালয়েশিয়ার শিল্পের চাহিদা আগে নির্ধারণ করে বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। এতে ১০ হাজার, ১৫ হাজার বা ২০ হাজার দক্ষ কর্মী তৈরি করা সম্ভব। দক্ষ কর্মীর আয় সাধারণ কর্মীর চেয়ে বেশি হওয়ায় এর প্রভাব রেমিট্যান্সেও পড়বে।
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজ: বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া থেকে কী ধরনের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে?
আনোয়ার শহীদ: আমরা মালয়েশিয়া ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (মিডা), ব্যবসায়ী সংগঠন এবং দক্ষতা উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করেছি। আসবাবশিল্পের মতো কিছু খাতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
মালয়েশিয়ায় উৎপাদন ব্যয় ও শ্রমবাজারের কিছু পরিবর্তনের কারণে কয়েকটি শিল্প অন্য দেশে সম্প্রসারণের সুযোগ খুঁজছে। বাংলাদেশ যদি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ, দক্ষ শ্রম এবং বিনিয়োগের সুবিধা দিতে পারে, তাহলে এসব শিল্পের একটি অংশ বাংলাদেশে আনা সম্ভব।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অন্যান্য উদীয়মান খাতেও আলোচনা হয়েছে। এখন প্রয়োজন আলোচনাগুলোকে প্রকল্প ও বিনিয়োগে রূপ দেওয়া।
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজ: তাহলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের পর তৈরি হওয়া কূটনৈতিক উষ্ণতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা কোথায়?
আনোয়ার শহীদ: পরীক্ষা হবে বাস্তব ফলাফলে। কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা তখনই এর সুফল দেখতে পাবেন, যখন নতুন পণ্য বাজারে যাবে, বিনিয়োগ আসবে, দক্ষ কর্মীর সুযোগ বাড়বে এবং রপ্তানি বাড়বে।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ককে শুধু আমদানি-রপ্তানি বা জনশক্তি রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। হালাল অর্থনীতি, প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন, পর্যটন, উৎপাদন ও বিনিয়োগ—এসব ক্ষেত্রেও সম্পর্ক বিস্তৃত করতে হবে।
আমরা এখন সেই জায়গাতেই কাজ করছি। সরকারের নীতিগত সহায়তা এবং ব্যবসায়ীদের উদ্যোগ একসঙ্গে এগোলে কূটনৈতিক সম্পর্কের উষ্ণতা অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ নিতে পারে।


