বিশেষ প্রতিনিধি:
বঙ্গোপসাগরকে শুধু ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, বরং আঞ্চলিক অর্থনীতি ও সহযোগিতার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাণিজ্য, জ্বালানি, সমুদ্রসম্পদ, যোগাযোগ, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়িয়ে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে যৌথ সমৃদ্ধির এলাকায় পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার ঢাকায় ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের (সিজিএস) আয়োজনে তিন দিনের এ সম্মেলন ৩ থেকে ৫ অক্টোবর ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য, ‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স, ফিউচারস: নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন আ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সমুদ্রবন্দর, নৌপথ, মৎস্য, পর্যটন, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব।
তার মতে, বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। ভৌগোলিক অবস্থান যখন দেশগুলোকে কাছাকাছি এনেছে, তখন জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ ও অংশীদারত্ব সেই সম্পর্ককে আরও কার্যকর করতে পারে।
দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির প্রসঙ্গেও নিজের সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা এবং উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতে নীতিগত নিশ্চয়তা ও দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে সরকারের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’ ও ‘হেলথ কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের মায়েদের কাছে আর্থিক সহায়তা পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা, কৃষিসেবা ও বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে হেলথ কার্ডের মাধ্যমে নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। ভবিষ্যতে এসব সেবাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় আনার জন্য ‘ইউনিভার্সেল কার্ড’ চালুর কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
স্বাস্থ্যসেবা তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। এসব কর্মী প্রাথমিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্য পরামর্শ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীকে পরবর্তী পর্যায়ের চিকিৎসার জন্য পাঠানোর কাজে যুক্ত থাকবেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণি থেকে বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, মিড-ডে মিল ও বৃত্তি দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। মেয়েদের জন্য স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার পরিধি সম্প্রসারণের কথা বলেন।
পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি জরুরি।
ভাষাগত দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি। তার ভাষায়, বাংলাদেশের তরুণদের বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার উপযোগী করে তুলতে হবে এবং ‘ব্রেইন ড্রেনকে ব্রেইন সার্কুলেশন’-এ রূপান্তর করতে হবে।
পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু সহনশীলতার জন্য আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদীপথ খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
পরিবেশ রক্ষায় পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এ লক্ষ্য এর আগে পরিবেশ বিষয়ক সরকারি কর্মসূচিতেও ঘোষণা করা হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবেশ রক্ষাকে উন্নয়নের বিপরীতে না দেখে উন্নয়নের সঙ্গে সমন্বয় করেই এগোতে হবে। নদী, বন, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা খাদ্য ও পানি নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর পাশাপাশি মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের সেবায় কার্যকরভাবে নিয়োজিত করার জন্য একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার কথা বলেন তিনি।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশটি এখনো প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। তাদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনকে বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
এ লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমর্থন ও অর্থায়ন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে সংকটের মূল কারণ সমাধানের ওপর জোর দিয়ে বলেন, সংকটের উৎপত্তি যেহেতু মিয়ানমারে, এর স্থায়ী সমাধানও সেখানেই হতে হবে।
ভাষণের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী আবারও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, সমুদ্রকে ঘিরে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতার ক্ষেত্রও তৈরি করা সম্ভব।
বাণিজ্য ও যোগাযোগের পাশাপাশি সমুদ্রসম্পদ, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও জলবায়ু মোকাবিলায় দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সংলাপ, অংশীদারত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে চায়। একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়েও বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ।
তাঁর প্রত্যাশা, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল এমন একটি পরিসরে পরিণত হবে যেখানে দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে এগিয়ে যেতে পারবে।
বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬-এ এ বছর ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও সংযোগ, জলবায়ু, মানবনিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও সুশাসনসহ বঙ্গোপসাগর ও বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।


