তানু রায়হানঃ
ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় আরেকটি বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। রাজধানীর গাবতলী থেকে পুরান ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জের দিকে মেট্রোরেল সংযোগ স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে যাত্রী পরিবহনের এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার আগে বড় হয়ে উঠেছে এর অর্থায়ন।
প্রস্তাবিত এমআরটি লাইন-২ বাস্তবায়নে প্রায় ৬০ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের প্রস্তাব ১৫ হাজার ৩৮ কোটি টাকা। বাকি ৪৫ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অর্থই বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল।
এই বিপুল অর্থায়নের উৎস এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিদেশি ঋণ সংগ্রহের লক্ষ্যে প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) পাঠানো হয়েছে। উন্নয়ন সহযোগী খুঁজতে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট ফান্ড সার্চিং কমিটি।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক, এআইআইবির সঙ্গে অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে প্রকল্পটি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং অর্থায়নের বিষয়ে উপস্থাপনাও দিয়েছে। তবে পুরো প্রকল্পের প্রয়োজনীয় অর্থ একটি মাত্র উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে একাধিক ঋণদাতাকে যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
ইআরডির বিশ্বব্যাংক শাখার যুগ্মসচিব মো। আশফাকুল আমিন মুকুট বলেন, প্রকল্পটির জন্য বড় অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংকের সম্ভাব্য অর্থায়নের পাশাপাশি বাকি অর্থের উৎস নিয়ে ফান্ড সার্চিং কমিটিতে আলোচনা হবে।
অর্থায়নের প্রশ্নের পাশাপাশি প্রকল্পটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি ঢাকার পুরান অংশকে প্রথমবারের মতো মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে।
প্রস্তাবিত রুট অনুযায়ী গাবতলী থেকে শুরু হয়ে মেট্রোরেলটি ঢাকা উদ্যান, বসিলা, মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট, আজিমপুর, লালবাগ, চকবাজার, মিটফোর্ড, নয়াবাজার, ধোলাইখাল, দয়াগঞ্জ, কাপ্তানবাজার ও ডেমরা হয়ে নারায়ণগঞ্জের দিকে যাবে।
পরিকল্পনায় গুলিস্তান থেকে নয়াবাজার হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত একটি শাখা লাইন রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।
প্রকল্পের প্রস্তাবিত দৈর্ঘ্য ৩০ দশমিক ৪০ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ২২ দশমিক ৯০ কিলোমিটার উড়ালপথ এবং ৭ দশমিক ৫০ কিলোমিটার পাতালপথ হিসেবে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। মোট ২৪টি স্টেশন রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রকল্পের পিডিপিপি অনুমোদনের পর এখন মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থের উৎস নিশ্চিত করা। পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাবটি পর্যালোচনার পর বৈদেশিক অর্থায়নের জন্য ইআরডিতে পাঠানো হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, মেট্রোরেল-২ প্রকল্পের পিডিপিপি অনুমোদনের পর উন্নয়ন সহযোগী খোঁজার জন্য তা ইআরডিতে পাঠানো হয়েছে। এখন অর্থায়নের কাঠামো নিয়ে কাজ চলছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, প্রাথমিক ও বিস্তারিত নকশা এবং দরপত্র প্রস্তুতের মতো কারিগরি কাজে সহায়তার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রকাশ্য প্রকল্প নথিতেও এমআরটি লাইন-২ এর প্রস্তুতিমূলক কাজ ও ডিএমটিসিএলের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর কথা উল্লেখ রয়েছে। সেখানে প্রায় ২৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার একটি অংশের প্রাথমিক কাঠামোর কথা বলা হয়েছে, যা পরবর্তী প্রকল্প পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
এমআরটি লাইন-২ এর অর্থায়ন কাঠামো থেকে স্পষ্ট, সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন নির্মাণ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থের ব্যবস্থা করা।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের বড় অংশ যদি বিদেশি ঋণ থেকে আসে, তাহলে অর্থায়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঋণের শর্ত, সুদ, পরিশোধকাল এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়ন সমন্বয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এআইআইবির সঙ্গেও অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত পুরো প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক অর্থায়ন চূড়ান্ত হয়েছে, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে বিভিন্ন পর্যায়ে এমআরটি-২-এর রুট ও অর্থায়ন পরিকল্পনায় পরিবর্তনের তথ্যও প্রকাশ্যে এসেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে প্রকল্পটির জন্য প্রায় ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক অর্থায়ন চাওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবির সঙ্গে আলোচনার তথ্য এসেছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাবতলী থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত এই মেট্রোরেল চালু হলে রাজধানীর পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চল, পুরান ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জের মধ্যে দ্রুত গণপরিবহনের নতুন করিডর তৈরি হবে। বিশেষ করে পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোকে মেট্রো নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে প্রকল্পটি এখনো অর্থায়ন নিশ্চিত করার পর্যায়ে রয়েছে। ফলে প্রস্তাবিত রুট, ব্যয় ও সময়সীমার পাশাপাশি বাস্তবায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হিসেবে সামনে থাকছে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকার বিদেশি ঋণ সংগ্রহ।
ফান্ড সার্চিং কমিটির বৈঠকে সম্ভাব্য উন্নয়ন সহযোগী ও অর্থায়নের কাঠামো নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এরপরই স্পষ্ট হতে পারে, ৬১ হাজার কোটি টাকার এই মেট্রোরেল প্রকল্পের বড় অংশের অর্থ কোন কোন উৎস থেকে আসবে এবং কী শর্তে আসবে।
মেট্রোরেলের নতুন এই করিডর শেষ পর্যন্ত কত দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগোবে, তার বড় অংশই এখন নির্ভর করছে সেই অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার ওপর।


