তানভীর রায়হান:
একজন যাত্রী বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে বৈধ পাসপোর্ট, ভ্রমণের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও বিমানের টিকিট। গন্তব্যে যাওয়ার প্রস্তুতিও সম্পন্ন। কিন্তু বোর্ডিংয়ের আগে তাকে এমন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হলো, যেগুলোর সঙ্গে তার পাসপোর্ট, ভিসা কিংবা নিরাপত্তা যাচাইয়ের সরাসরি সম্পর্ক কতটা, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।
প্রশ্নগুলো ছিল, তিনি বিবাহিত কি না, পরিবারের সদস্যরা তার বিদেশযাত্রার বিষয়টি জানেন কি না, কেন অভিভাবক ছাড়া যাচ্ছেন।
ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ যাত্রী ছিলেন তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী। গত ৮ আগস্ট নেপাল যাওয়ার সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাদের আটকে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরে বিষয়টি গড়িয়েছে হাইকোর্টে। ২৯ সেপ্টেম্বর আদালত জানতে চেয়েছেন, বৈধ পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি থাকা সত্ত্বেও তাদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়া কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না। একই সঙ্গে আইনগত ভিত্তি ছাড়া ভবিষ্যতে তাদের বিদেশযাত্রায় বাধা না দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এখন তাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত শুধু তিন নারীর সঙ্গে কী ঘটেছিল তা নয়। বরং বড় প্রশ্ন হলো, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে দেশ ছাড়ার অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের সীমা কোথায়?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের বাংলাদেশ ত্যাগ ও পুনঃপ্রবেশের অধিকার স্বীকৃত। তবে এই অধিকার আইনের মাধ্যমে জনস্বার্থে যুক্তিসংগতভাবে সীমিত করা যেতে পারে। অর্থাৎ বিদেশযাত্রা কোনো শর্তহীন অধিকার নয়; কিন্তু বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রেও আইনি ভিত্তি প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার, ১৯৭৩-এও বিদেশযাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্দিষ্ট কিছু কারণ উল্লেখ রয়েছে। যেমন, নির্দিষ্ট অপরাধে দণ্ড, আদালতের মাধ্যমে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি, মানবপাচার বা অবৈধ কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার মতো বিষয়।
কিন্তু একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী অবিবাহিত, এটি পাসপোর্ট অর্ডারে বিদেশযাত্রা নিষিদ্ধ করার সাধারণ কারণ হিসেবে উল্লেখ নেই। একইভাবে, প্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারীকে বিদেশ যেতে বাবা, মা, স্বামী বা অন্য কোনো অভিভাবকের অনুমতি নিতে হবে, এমন সাধারণ শর্তও ওই আইনে দেখা যায় না।
সুতরাং তিন নারীর ঘটনায় মূল প্রশ্নটি হওয়া উচিত, তাদের আটকানোর সময় কর্তৃপক্ষের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো আইনগত কারণ ছিল কি না।
ইমিগ্রেশন কি শুধু কাগজপত্র দেখে? অবশ্যই নয়।
ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার দায়িত্ব শুধু পাসপোর্টে সিল মারা নয়। যাত্রীর পরিচয়, নথির সত্যতা, ভ্রমণের বৈধতা, আদালতের নিষেধাজ্ঞা, নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট তথ্য কিংবা অন্য কোনো আইনগত বাধা আছে কি না, এসব যাচাই করার ক্ষমতা প্রশাসনের থাকতে হবে।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন আইনে নির্ধারিত যাচাইয়ের সঙ্গে সামাজিক ধারণা মিশে যায়।
কোনো নারী একা ভ্রমণ করছেন, এটি সন্দেহের কারণ হতে পারে কি না, তা পরিস্থিতিনির্ভর। কিন্তু তিনি অবিবাহিত, এটি নিজেই কোনো অপরাধ নয়। একইভাবে, তার পরিবার ভ্রমণের বিষয়টি জানে কি না, এটিও প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের বিদেশযাত্রার সাধারণ আইনগত শর্ত নয়।
তবে যদি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় মানবপাচার, জোরপূর্বক বিদেশে পাঠানো, প্রতারণা বা অন্য কোনো অপরাধের বাস্তব আশঙ্কা থাকে, তখন কর্মকর্তার অনুসন্ধান করার প্রয়োজন হতে পারে। প্রশ্ন হলো, সেই অনুসন্ধান কি প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে, নাকি শুধু একজন নারীর বৈবাহিক পরিচয়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে?
এই দুইয়ের পার্থক্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। ‘পরিবার জানে কি না’, প্রশ্নটি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?
একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বিদেশে যাওয়ার আগে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করবেন কি না, সেটি পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়। পরিবারকে জানানো সামাজিকভাবে কাম্য হতে পারে। পরিবারের কেউ উদ্বিগ্নও হতে পারেন।
কিন্তু পরিবারকে জানানো এবং পরিবারের অনুমতি নেওয়া এক বিষয় নয়।
রাষ্ট্রের কোনো কর্মকর্তা যদি নিরাপত্তা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন মনে করেন, তার নির্দিষ্ট কারণ থাকতে পারে। কিন্তু পরিবারের সম্মতি না থাকলে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী দেশ ছাড়তে পারবেন না, এমন কোনো সাধারণ নিয়ম থাকলে তার স্পষ্ট আইনগত ভিত্তি থাকা প্রয়োজন।
এখানেই প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং ব্যক্তিগত জীবনের সীমারেখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
রাষ্ট্র নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে; কিন্তু নাগরিকের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের জায়গায় রাষ্ট্র নিজে পরিবারের ভূমিকায় বসবে কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন।
হাইকোর্টে করা রিটে তিন নারী, রিফা তামান্না, সোহানি ইসলাম সমাপতি ও নাজনিন, দাবি করেছেন, ৮ আগস্ট নেপাল যাওয়ার সময় তাদের বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হয়। তাদের আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, তারা বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল মেডিয়েশন সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি সম্মেলনে অংশ নিতে যাচ্ছিলেন এবং প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি তাদের ছিল। অভিযোগ রয়েছে, তাদের অবিবাহিত হওয়া এবং বাবা-মা বা অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ নিয়ে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা প্রশ্ন করেছিলেন।
হাইকোর্ট অবশ্য এখনো চূড়ান্তভাবে বলেননি যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বেআইনি কাজ করেছেন। আদালত রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, কেন ওই পদক্ষেপকে বেআইনি ঘোষণা করা হবে না। একই সঙ্গে অভিযোগটি তদন্ত করে সাত দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি এবং আদালতে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। এ কারণে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক হবে না।
বরং আদালতের প্রশ্নটিই গুরুত্বপূর্ণ, আইন কোথায় এমন ক্ষমতা দিয়েছে?
এটিও একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন।
একজন অবিবাহিত পুরুষ একা বিদেশে গেলে কি তাকে একইভাবে জিজ্ঞেস করা হয়, বিয়ে করেছেন কি না, পরিবার জানে কি না, বাবা-মায়ের অনুমতি আছে কি না?
যদি না হয়, তাহলে একই পরিস্থিতিতে নারীর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রশ্নের প্রয়োজন কেন, তার একটি যুক্তিসংগত ও আইনভিত্তিক ব্যাখ্যা থাকা দরকার।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতার কথা বলা হয়েছে। ২৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র শুধু লিঙ্গের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করবে না এবং নারীর রাষ্ট্রীয় ও জনজীবনের সব ক্ষেত্রে পুরুষের সমান অধিকার রয়েছে।
তাই কোনো প্রশাসনিক পদ্ধতিতে নারী-পুরুষের জন্য ভিন্ন আচরণ থাকলে সেটির আইনগত ভিত্তি ও প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
এখানে আরেকটি দিকও উপেক্ষা করা যায় না।
মানবপাচার, প্রতারণা, জোরপূর্বক বিদেশে পাঠানো কিংবা অবৈধভাবে বিদেশে নেওয়ার ঘটনা বাস্তব ঝুঁকি হতে পারে। এসব ঠেকাতে ইমিগ্রেশনকে প্রয়োজনীয় যাচাইয়ের ক্ষমতা অবশ্যই দিতে হবে।
কিন্তু নিরাপত্তা যাচাইয়ের কার্যকর পদ্ধতি কী হবে, সেটিও নির্ধারিত থাকা দরকার।
যদি কোনো নির্দিষ্ট ঝুঁকির তথ্য থাকে, সেটি যাচাই করা যেতে পারে। যদি নথিতে অসঙ্গতি থাকে, সেটি খতিয়ে দেখা যেতে পারে। যদি আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকে, যাত্রা বন্ধ করা যেতে পারে।
কিন্তু ‘অবিবাহিত নারী’, এই পরিচয়কে যদি নিজেই ঝুঁকির সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তখন প্রশ্ন উঠবে সেই ঝুঁকির সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করেছে এবং তার আইনগত ভিত্তি কী।
এই ঘটনা শুধু নারীর বিদেশযাত্রা নিয়ে বিতর্ক নয়। এটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি আরও স্পষ্ট করার একটি সুযোগও তৈরি করেছে।
ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা কোন পরিস্থিতিতে একজন যাত্রীকে আটকাতে পারবেন, কতক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন, কী ধরনের নথি চাইতে পারবেন এবং কোন কারণে কাউকে দেশত্যাগে বাধা দেওয়া যাবে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার লিখিত নির্দেশনা থাকলে কর্মকর্তাদের জন্যও কাজ সহজ হবে, যাত্রীদের জন্যও অনিশ্চয়তা কমবে।
বিশেষ করে নারী যাত্রীদের ক্ষেত্রে কোনো অতিরিক্ত যাচাই প্রয়োজন হলে তার কারণও নির্দিষ্ট হওয়া দরকার।
কারণ একজন কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত শুধু একজন যাত্রীর ওপর প্রভাব ফেলে না। সেই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একটি প্রশাসনিক সংস্কৃতির বার্তাও তৈরি হয়।
বিমানবন্দরে একজন নাগরিকের সামনে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি যখন প্রশ্ন করেন, তখন সেই প্রশ্নের পেছনে রাষ্ট্রের আইন থাকার কথা, ব্যক্তিগত ধারণা নয়।
কেউ বিবাহিত কি না, একা ভ্রমণ করছেন কি না কিংবা পরিবারের সদস্যরা তার সিদ্ধান্ত জানেন কি না, এসব তথ্য কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। কিন্তু এগুলোকে বিদেশযাত্রা বন্ধের কারণ বানাতে হলে তার আইনগত ভিত্তি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের আইনে বিদেশযাত্রার ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের সুযোগ আছে। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার জায়গাগুলোও নির্ধারিত। পাসপোর্ট অর্ডারেও দেশত্যাগে বাধা দেওয়ার নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে।
তাই তিন নারীর ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, তারা নারী ছিলেন কি না, অবিবাহিত ছিলেন কি না, কিংবা পরিবারের অনুমতি ছিল কি না, তা নয়।
প্রশ্ন হলো, তাদের থামানোর সময় রাষ্ট্রের হাতে কোন আইন ছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার হলে শুধু তিন নারীর বিষয়টির সমাধান হবে না; ভবিষ্যতে বিমানবন্দরে একজন নাগরিকের অধিকার ও একজন কর্মকর্তার ক্ষমতার সীমারেখাও আরও স্পষ্ট হবে।
আর সেটিই একটি কার্যকর প্রশাসনের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা যেন অনুমানের ওপর নয়, আইনের ওপর দাঁড়ায়।


