আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
দুই কোরিয়ার সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে উত্তর কোরিয়া। সীমান্তে তিন দক্ষিণ কোরীয় সেনা আহত হওয়ার ঘটনায় পিয়ংইয়ংয়ের কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল সিউল। তবে সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি সামরিক সক্ষমতার আরেকটি প্রদর্শন করল কিম জং উনের সরকার।
শনিবার ভোরে উত্তর কোরিয়ার পূর্ব উপকূলীয় ওনসান এলাকা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ (জেসিএস) জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রটি পূর্ব সাগরের দিকে ছোড়া হয় এবং ৭০০ কিলোমিটারের বেশি পথ অতিক্রম করে। এর সুনির্দিষ্ট ধরন ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য শনাক্তে বিশ্লেষণ চলছে।
দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান ঘটনাটি নিয়ে তথ্য বিনিময় করছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তবে উৎক্ষেপণটি সরাসরি সীমান্তের মাইন বিস্ফোরণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে করা হয়েছে—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পিয়ংইয়ং দেয়নি।
দুই কোরিয়ার সীমান্তবর্তী অসামরিকীকৃত অঞ্চল বা ডিএমজেডে গত ২১ সেপ্টেম্বর মাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সেনা আহত হন। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘ কমান্ডের তদন্তে বলা হয়, উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা মাইনের কারণে বিস্ফোরণটি ঘটে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তের দক্ষিণ পাশে টহল ও পথ পরিষ্কারের কাজ চলার সময় বিস্ফোরণ ঘটে। আহত তিন সেনার মধ্যে দুজন গুরুতর আহত হন।
তবে উত্তর কোরিয়া শুরু থেকেই এ ঘটনায় নিজেদের দায় অস্বীকার করে আসছে। শুক্রবার কিম জং উনের বোন ও দেশটির প্রভাবশালী নেতা কিম ইয়ো জং দক্ষিণ কোরিয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। একই সঙ্গে সিউলের বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।
এর আগে দক্ষিণ কোরিয়া ঘটনাটিকে ১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে উত্তর কোরিয়াকে দায় স্বীকার ও ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানায়। সীমান্ত এলাকায় মাইন পোঁতা এবং সামরিক অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধেরও আহ্বান জানানো হয়।
১৯৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধের যুদ্ধবিরতির পর দুই কোরিয়ার মধ্যে প্রায় চার কিলোমিটার প্রশস্ত ডিএমজেড গড়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক স্থলমাইন রয়েছে। ফলে সীমান্ত এলাকায় সামরিক ও অবকাঠামোগত যেকোনো তৎপরতা ঝুঁকিপূর্ণ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়া সীমান্ত এলাকায় নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার কাজ করছে। পিয়ংইয়ংয়ের সেনারা বিভিন্ন স্থানে মাইন পোঁতার পাশাপাশি ট্যাংক চলাচল ঠেকাতে প্রতিবন্ধক নির্মাণ করছে বলে দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
২০২৪ সালে কিম জং উন দক্ষিণ কোরিয়াকে ‘প্রধান শত্রু’ হিসেবে ঘোষণা করার পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও অবনতির দিকে যায়। এরপর সীমান্তে যোগাযোগ ও সামরিক উত্তেজনা কমানোর পুরোনো ব্যবস্থাগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ে।
মাইন বিস্ফোরণের দায় নিয়ে যখন দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য চলছে, ঠিক তখনই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকে পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
সাবেক ইউনিভার্সিটি অব নর্থ কোরিয়ান স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট ইয়াং মু-জিন এএফপিকে বলেন, সিউল উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ নিলেও পিয়ংইয়ং তার জবাবে উত্তেজনা বাড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে।
তার মতে, উত্তর কোরিয়ার অবস্থান থেকে এমন একটি বার্তা পাওয়া যাচ্ছে যে, দক্ষিণ কোরিয়ার সদিচ্ছার জবাবে তারা আলোচনার পরিবর্তে সংঘাতের সক্ষমতা প্রদর্শনকেই গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সঙ্গে সীমান্তের মাইন বিস্ফোরণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। একইভাবে মাইন বিস্ফোরণের দায় নিয়েও দুই পক্ষের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী।
ফলে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে স্পষ্ট বিষয় হলো—দুই কোরিয়ার মধ্যে আস্থার সংকট আরও গভীর হয়েছে। সীমান্তে সামরিক তৎপরতা, মাইন বিস্ফোরণ এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের মতো ঘটনাগুলো সেই উত্তেজনাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।


