তনু:
দূরপাল্লার যাত্রায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠা স্লিপার বাস এবার নির্দিষ্ট কারিগরি ও নিরাপত্তা মানের আওতায় আসছে। দীর্ঘদিন কোনো পৃথক নীতিমালা ছাড়াই চলা এ ধরনের বাসের বডি নির্মাণ ও পরিচালনায় প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।
প্রস্তাবিত নীতিমালায় পুরোনো বা ব্যবহৃত চেসিস দিয়ে স্লিপার বাস নির্মাণের সুযোগ রাখা হয়নি। প্রতিটি বাসে নতুন চেসিস, পেছনে টেনডেম এক্সেল, সব এক্সেলে এয়ার সাসপেনশন এবং এবিএস বা উন্নত প্রযুক্তির ব্রেকিং ব্যবস্থা রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যাত্রী নিরাপত্তায় জরুরি বহির্গমন দরজা, জরুরি জানালা, স্মোক ডিটেক্টর ও অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিআরটিএর তৈরি করা ‘স্লিপার বাস গাইডলাইন/নীতিমালা, ২০২৬’-এর খসড়াটি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠানো হয়েছে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মন্ত্রণালয়ে এ নিয়ে আলোচনা চলছে এবং ইতিমধ্যে একটি সভাও হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে স্লিপার বাসের কয়েকটি দুর্ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার পর এ ধরনের বাসের কাঠামো ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তৈরি খসড়ায় বাসের চেসিস থেকে শুরু করে বার্থের নকশা, ওজন ধারণক্ষমতা, স্থিতিশীলতা এবং অগ্নিনিরাপত্তা, সব ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট মানদণ্ড প্রস্তাব করা হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, স্লিপার বাস তৈরিতে সম্পূর্ণ নতুন চেসিস ব্যবহার করতে হবে। বাসের পেছনে টেনডেম এক্সেল এবং সব এক্সেলে এয়ার সাসপেনশন অথবা এর চেয়ে উন্নত প্রযুক্তির সাসপেনশন থাকতে হবে। ব্রেকিং ব্যবস্থায় থাকতে হবে এবিএস বা উন্নত প্রযুক্তি।
বাসের মোট ওজনও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখতে হবে। যাত্রী ও মালামালসহ বাসটির সর্বোচ্চ অনুমোদিত ওজন ২১ টনের বেশি হতে পারবে না। সর্বোচ্চ উচ্চতা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে ৪ দশমিক ২৫ মিটার।
বাসের কাঠামোগত দৃঢ়তা নিশ্চিত করতে মূল প্রস্তুতকারকের কারিগরি নির্দেশনা ও নকশা অনুসরণের পাশাপাশি বিআরটিএর স্থায়ী টেকনিক্যাল কমিটির নির্ধারিত পদ্ধতিও মানতে হবে।
স্লিপার বাসে যাত্রীদের শোয়ার জায়গা বা বার্থের আকার নিয়েও বিস্তারিত শর্ত রাখা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতিটি বার্থের দৈর্ঘ্য কমপক্ষে ১ হাজার ৮০০ মিলিমিটার হতে হবে।
এক সারিতে তিনটি বার্থ থাকলে প্রতিটির প্রস্থ কমপক্ষে ৬০০ মিলিমিটার এবং দুটি বার্থ থাকলে প্রস্থ ৬৫০ থেকে ৭৫০ মিলিমিটারের মধ্যে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
শুধু আকার নয়, বার্থের কাঠামোগত সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি বার্থকে ৩০০ কেজি ওজন বহনে সক্ষম হতে হবে। যাত্রী যাতে চলন্ত অবস্থায় পড়ে না যান, সে জন্য দুই পাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী রাখার শর্ত রয়েছে। ওপরের বার্থে ওঠানামার জন্য হাতলসহ সিঁড়িও থাকতে হবে।
যাত্রীসেবার জন্য প্রতিটি বার্থে কলিং লাইট ও কলবেল, রিডিং লাইট, হেডরেস্ট, আর্মরেস্ট এবং খাবারের ট্রে রাখার ভাঁজযোগ্য টেবিল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাসের স্থিতিশীলতা পরীক্ষার সময় প্রতিটি বার্থে ৭৫ কেজি ওজন প্রয়োগ করে পরীক্ষা করার কথাও বলা হয়েছে।
স্লিপার বাসে অগ্নিনিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে খসড়া নীতিমালায়। প্রতিটি বাসে প্রয়োজনীয় সংখ্যক অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডারের পাশাপাশি অন্তত তিনটি স্মোক ডিটেক্টর রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
আগুন বা দুর্ঘটনার সময় যাত্রীদের দ্রুত বের করে আনার জন্য রাখতে হবে জরুরি নির্গমন দরজা। নিচের ও ওপরের ডেকেও জরুরি জানালা রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সেফটি গ্লাস ভাঙার জন্য প্রয়োজনীয় হাতুড়ি এবং সার্ভিস দরজার এয়ারলক খোলার ম্যানুয়াল ভালভ রাখার শর্ত রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার উপকরণ নিয়েও থাকছে নিরাপত্তার শর্ত। বার্থের আসন ও প্যাডে অগ্নিপ্রতিরোধক ফোম ব্যবহার করতে হবে। আসনের কভার, পর্দা, প্লাইউড, ফ্লোরিংসহ অন্যান্য অভ্যন্তরীণ উপকরণেও নির্ধারিত দাহ্যতা মান নিশ্চিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিআরটিএর খসড়ায় বলা হয়েছে, দেশে স্লিপার বাসের যাত্রী চাহিদা ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হলেও এতদিন এ ধরনের বাসের বডি নির্মাণ ও চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা ছিল না। অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্নভাবে স্লিপার বাস তৈরি করে সড়কে চলাচলের বিষয়টিও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমানে দেশে ৮০০টির বেশি স্লিপার বাস চলাচল করছে বলে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সম্পূর্ণ তৈরি বা সিবিইউ অবস্থায় আমদানি করা স্লিপার বাস দেশে নেই। একই সঙ্গে স্লিপার বাসের বডি নির্মাণে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানও নেই বলে জানিয়েছে বিআরটিএ।
এ কারণে বিভিন্ন দেশের প্রচলিত গাইডলাইন থেকে তথ্য নিয়ে দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘জরুরি প্রয়োজন ও বিশেষ বিবেচনায়’ খসড়াটি তৈরি করা হয়েছে।
নীতিমালা চূড়ান্ত হলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের মুখে পড়তে হবে স্লিপার বাস মালিকদের। নতুন চেসিস, উন্নত সাসপেনশন ও ব্রেকিং ব্যবস্থা এবং অগ্নিনিরাপত্তার সরঞ্জাম যুক্ত করার ফলে বাস নির্মাণ ও রূপান্তরের ব্যয় বাড়তে পারে।
স্লিপার এসি বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বাবু বলেন, ২০১৪ সাল থেকে দেশে স্লিপার বাস চলাচল করছে। এতদিন এ খাতের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় বিষয়টির দায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপরও রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, তারা নিষেধাজ্ঞার বিপক্ষে, তবে নীতিমালার পক্ষে। এ খাতে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ এবং দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, বুয়েটের কারিগরি পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংশোধন করে নীতিমালার আওতায় স্লিপার বাস পরিচালনা করতে চান তারা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো। এহসান বলেন, স্লিপার বাসের জন্য নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে নির্ধারিত কারিগরি মান বাস্তবায়ন করতে গেলে মালিকদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হবে।
তার মতে, শুরু থেকেই নির্দিষ্ট নিয়ম থাকলে তা বাস্তবায়ন করা তুলনামূলক সহজ হতো। দীর্ঘদিন কোনো খাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকার পর নতুন করে নিয়ম চালু করলে বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বিআরটিএ অধিশাখার যুগ্মসচিব মো। আব্দুস সোবহান বলেন, স্লিপার বাসের খসড়া নীতিমালা বিআরটিএ থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে এবং ইতিমধ্যে একটি সভা হয়েছে। তবে নীতিমালাটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এ বিষয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে কার্যালয়ে গিয়ে এবং মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা পাওয়া যায়নি।
নীতিমালাটি চূড়ান্ত হলে স্লিপার বাসের জন্য শুধু যাত্রীসেবার আরাম নয়, বরং চেসিস, ভারসাম্য, ব্রেকিং, অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি পরিস্থিতিতে যাত্রী উদ্ধারের সক্ষমতাকেও অনুমোদনের অন্যতম শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হবে।


