সিএনএস ডেস্ক:
সকাল থেকে রাত, চেয়ারে বসে কাজ, দীর্ঘ সময় গাড়িতে যাতায়াত, হাতে মুঠোফোন, আর দিনের শেষে বিছানায় গিয়ে শরীরকে একেবারে স্থির করে রাখা। আধুনিক জীবনের এই অভ্যাসগুলো শরীরকে হয়তো বিশ্রাম দেয়, কিন্তু সব সময় স্বস্তি দেয় না। বরং অনেকের ক্ষেত্রে দিনের শেষে শুরু হয় কোমর ও পিঠের নিচের অংশে টান, ব্যথা কিংবা অস্বস্তি।
কোমর ব্যথা এমন একটি সমস্যা, যার সঙ্গে জীবনের কোনো না কোনো সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষকে লড়তে হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ কোমর ব্যথায় আক্রান্ত ছিলেন। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার ধারাবাহিকতায় ২০৫০ সালে এই সংখ্যা প্রায় ৮৪ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে কোমর ব্যথা মানেই যে বড় কোনো রোগ, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিনের ভুল ভঙ্গি, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, পেশিতে টান কিংবা দৈনন্দিন জীবনযাপনের নানা অভ্যাস এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, কোমর ব্যথার প্রায় ৯০ শতাংশই নন-স্পেসিফিক; অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনো বড় রোগ বা কাঠামোগত সমস্যার কারণে তা হয় না।
কোমরে ব্যথা শুরু হলেই অনেকের প্রথম প্রতিক্রিয়া, সব ধরনের নড়াচড়া বন্ধ করে দেওয়া। কিন্তু সব ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকা উপকারী নয়। বরং উপযুক্ত ও নিরাপদ নড়াচড়া শরীরের স্বাভাবিক গতিশীলতা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
৬৩ বছর বয়সি ফিটনেস ট্রেইনার জ্যাকলিন হুটন ২০২৫ সালের অক্টোবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করে কোমর ও পিঠের অস্বস্তি কমাতে কয়েকটি সহজ ব্যায়াম দেখান। তার ব্যায়ামগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল কোমর, নিতম্ব ও শরীরের নিচের অংশের পেশিগুলোকে ধীরে ধীরে প্রসারিত ও সচল রাখা।
তবে কোনো ব্যায়াম সবার জন্য সমানভাবে উপযোগী নয়। বিশেষ করে তীব্র বা অস্বাভাবিক ব্যথা থাকলে ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শরীরকে আবার একটু নড়াচড়া করানো
দিনের ব্যস্ততায় আলাদা করে জিমে যাওয়ার সুযোগ না থাকলেও কিছু সহজ স্ট্রেচিং শরীরের দৈনন্দিন রুটিনে রাখা যায়। এগুলোর উদ্দেশ্য জোর করে শরীর বাঁকানো নয়; বরং ধীরে ধীরে পেশির টান কমিয়ে স্বাভাবিক নড়াচড়া ফিরিয়ে আনা।
সাইড স্ট্রেচ ও ফরওয়ার্ড ফোল্ড
সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে প্রথমে শরীরকে একদিকে ধীরে বাঁকানো যায়। এরপর আবার সোজা হয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে হাত নিচের দিকে নামিয়ে আনা হয়। এতে কোমর ও শরীরের পাশের অংশে হালকা প্রসারণ তৈরি হয়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শরীরকে জোর করে নিচে নামানো যাবে না।
নি-টু-চেস্ট স্ট্রেচ
চিৎ হয়ে শুয়ে হাঁটু ভাঁজ করে ধীরে ধীরে বুকের দিকে নিয়ে আসতে হয়। দুই হাত দিয়ে হাঁটু বা ঊরু ধরে কিছুক্ষণ অবস্থান করা যায়। কোমরের নিচের অংশ ও আশপাশের পেশিতে হালকা টান অনুভূত হতে পারে।
সিঙ্গেল লেগ স্ট্রেচ
এক পা মেঝেতে রেখে অন্য পায়ের হাঁটু ধীরে ধীরে বুকের দিকে টেনে আনা হয়। এরপর পা বদলে একইভাবে অন্য পাশেও করা যায়। এতে কোমর ও নিতম্বের আশপাশের পেশি প্রসারিত হতে পারে।
পেলভিক টিল্ট
চিৎ হয়ে শুয়ে দুই হাঁটু ভাঁজ করে পা মেঝেতে রাখতে হয়। এরপর কোমর ও নিতম্বের অবস্থান নিয়ন্ত্রিতভাবে সামান্য পরিবর্তন করা হয়। এই ব্যায়ামটি শরীরের কোর বা মধ্যবর্তী অংশের পেশি সক্রিয় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
ক্যাট-কাউ
হাত ও হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে শুরু করতে হয়। এরপর ধীরে ধীরে পিঠকে ওপরের দিকে বাঁকিয়ে আবার বিপরীত দিকে নামানো হয়। মেরুদণ্ডের নড়াচড়া বাড়ানোর জন্য এটি পরিচিত একটি সহজ স্ট্রেচিং।
চাইল্ডস পোজ
হাত ও হাঁটুর অবস্থান থেকে নিতম্ব ধীরে ধীরে পেছনের দিকে নিয়ে গোড়ালির কাছে বসতে হয়। দুই হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে রাখা যায়। এতে কোমর, পিঠ ও কাঁধের পেশিতে হালকা প্রসারণ তৈরি হয়।
স্পাইনাল টুইস্ট
চিৎ হয়ে শুয়ে একটি হাঁটু ভাঁজ করে শরীরের বিপরীত পাশে ধীরে নামিয়ে আনা হয়। অন্য হাতটি পাশে প্রসারিত রাখা যায়। এতে মেরুদণ্ড ও কোমরের নিচের অংশে নিয়ন্ত্রিত ঘূর্ণন তৈরি হয়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের নমনীয়তা ও পেশির শক্তি কমতে পারে। ফলে দীর্ঘ সময় একই অবস্থানে বসে থাকা কিংবা শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা কোমর ও পিঠের অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
তাই বয়সের সঙ্গে শরীরের প্রতি যত্নের ধরনও বদলানো প্রয়োজন। প্রতিদিনের হাঁটা, প্রয়োজন অনুযায়ী হালকা স্ট্রেচিং এবং দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে না থাকা শরীরকে সচল রাখতে সহায়ক হতে পারে।
তবে ব্যথার ধরন বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পায়ে দুর্বলতা বা অসাড়তা, প্রস্রাব-পায়খানা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা, জ্বরের সঙ্গে তীব্র কোমরব্যথা, বড় ধরনের আঘাতের পর ব্যথা কিংবা ক্রমাগত বাড়তে থাকা ব্যথা হলে শুধু ব্যায়ামের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কোমর ব্যথা এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর অভ্যাসগুলোর একটি হতে পারে শরীরকে একেবারে স্থির না রাখা। কাজের ফাঁকে উঠে দাঁড়ানো, কিছুক্ষণ হাঁটা, বসার ভঙ্গি ঠিক রাখা এবং শরীরের সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত নড়াচড়া, ছোট ছোট এই অভ্যাসগুলোই দীর্ঘমেয়াদে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
শরীরের সংকেতকে উপেক্ষা না করে, আবার অকারণে ভয় না পেয়ে, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নিরাপদভাবে সচল থাকাই হতে পারে সুস্থ থাকার সহজ পথ।


